এইসব লক্ষণে বুঝবেন আপনার বৃদ্ধ পিতামাতার আরও বেশী সেবা প্রয়োজন

পিতামাতার সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তারা যখন বার্ধক্যে পৌঁছান বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের সমস্যাও বেড়ে যায়। তখন তাদেরকে অধিক সেবা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এ প্রতিবেদনে ৭টি লক্ষণ উল্লেখ করা হলো, যা দেখে বুঝবেন আপনার বয়স্ক প্রিয়জনদের শিগগির অধিক সেবা প্রয়োজন।

অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাস: যখন বৃদ্ধ পিতামাতা ওজন হারাতে শুরু করবে, আপনাকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের কি মুখ বা দাঁত ব্যথা আছে? তাদের কি চর্বণ করতে বা গিলতে সমস্যা হয়? তাদের কি বমিবমি ভাব বা পেটভরা ভাব হয়? তারা কি খাবার মজা পাচ্ছে না? খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো সমস্যার জন্য আপনার পিতামাতাকে অবিলম্বে ডাক্তার দেখানো উচিত।

যদি তারা খাবার উপভোগ না করে, তাহলে তাদেরকে পুষ্টিসমৃদ্ধ ছোট স্ন্যাক সাজেস্ট করতে পারেন যা তারা সারাদিন ধরে খেতে পারে: উচ্চ ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার যেমন- পনির, দই, পিনাট বাটার এবং কটেজ চিজ ভালো। আপনার পিতামাতা যা পছন্দ করে ও খেতে চায় তাতে

গুরুত্ব দিন। যদি ওটমিল প্রিয় হয়, তাহলে এর সঙ্গে বাটার, ব্রাউন সুগার, কিশমিশ, শুকনো ক্র্যানবেরি, কাজুবাদাম অথবা আখরোট বাদাম যুক্ত করুন। আপনার পিতামাতাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তারা এমন এক বয়সে আছে যখন ক্যালরি সীমিত করা উচিত নয়।

ব্রাইটস্টার কেয়ারের চিফ কোয়ালিটি অফিসার এবং কেয়ারগিভিং অ্যান্ড হেলথকেয়ার এক্সপার্ট শ্যারন রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘প্রোটিন পানীয়ও বিবেচনা করুন। মার্কেটে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ অনেক প্রোটিন পাউডার পাওয়া যায় যা উচ্চমানের ক্রিমারের বিকল্প হিসেবে আইসক্রিমের ওপর বা কফিতে ঢেলে খেতে সুস্বাদু।’ প্রিয় খাবার বা পানীয় অথবা এমনকি প্যানকেক, ডেজার্ট ব্রেড, পটেটো ডিশ এবং স্যুপর মতো রেসিপির সঙ্গেও প্রোটিন পাউডার যুক্ত করা যেতে পারে।

দুর্বল ভারসাম্য: বৃদ্ধদের জন্য মারাত্মক হতে পারে পড়ে যাওয়া, তাই আপনার পিতামাতা আশপাশে যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। নিশ্চিত হোন যে তাদের কক্ষ নিরাপদ: আলোকসজ্জার উন্নয়ন করে, পাপোশ ও টলায়মান বা ঝুঁকিপূর্ণ আসবাবপত্র দূর করে এবং যন্ত্রপাতি ও ল্যাম্প কর্ড যাতে ক্ষতির কারণ না হয় তা নিশ্চিত করে আপনি তাদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারেন।

যদি ভারসাম্য সমস্যা হঠাৎ বা সম্প্রতি দেখা দেয় তাহলে ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করুন: নতুন ওষুধ, ওষুধের পরিবর্তন, কানের ভেতর ইনফেকশন, রক্তচাপের পরিবর্তন এবং ডায়াবেটিস বা রক্ত শর্করার হ্রাসবৃদ্ধি হতে পারে তাদের পড়ে যাওয়ার কারণ।

আপনার বৃদ্ধ পিতামাতার কেন বা ওয়াকারের প্রয়োজন হতে পারে অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে কোনো ডাক্তার বা ফিজিক্যাল থেরাপিস্টের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। যদি তাদের ব্যালেন্স অত্যধিক খারাপ না হয় তাহলে শিথিলতা, ভারসাম্য ও স্বাস্থ্যের জন্য মেডিটেটিভ ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ ‘তাই চি’ সাজেস্ট করতে পারেন! তাই চি বিষয়ক গবেষণা বলছে যে, এটি বৃদ্ধদের ভারসাম্যের জন্য বিস্ময়করভাবে কাজ করে।

রথ ম্যাগুইয়ার বলেন, ‘তাদের টলায়মানতা বা দুর্বল ভারসাম্য দ্রুত তদারক করা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পড়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে এবং দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া ডিজি স্পেল বা ভারসাম্য হারানোর সম্ভাবনার কারণে বৃদ্ধ প্রাপ্তবয়স্করা কার্যক্রম সীমিত করতে পারে এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।’

নিম্নগামী মেজাজ: রথ ম্যাগুয়ার সতর্ক করেন, ‘হঠাৎ করে মেজাজ নিচের দিকে নেমে গেলে অথবা মেজাজ খারাপ হলে তা কোনো মারাত্মক লক্ষণ হতে পারে।’ এটি হরমোনগত ভারসাম্যহীনতা, ওষুধের সমস্যা, বন্ধুবিয়োগ অথবা একাকিত্বের নির্দেশ করতে পারে। যদি এ সমস্যা লেগে থাকে, আপনি কোনো সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং সেশনের কথা ভাবতে পারেন এবং এমন কাউকে খুঁজুন যিনি বার্ধক্যে বিশেষজ্ঞ। রথ

ম্যাগুয়ার বলেন, ‘বিষণ্নতা মারাত্মক হতে পারে- বিশেষ করে বার্ধক্যগ্রস্ত পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার খুব বেশি।’ তিনি যোগ করেন, ‘তাদের বিরূপ মেজাজকে গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত। ঘর থেকে অস্ত্র বা জীবননাশক উপকরণ সরিয়ে ফেলতে আমি বিশেষত বার্ধক্যগ্রস্ত পুরুষদের আত্ম-ক্ষতি বা আত্মহত্যার ভাবনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা করি না।’

নিশ্চিত হোন যে আপনার পিতামাতা সামাজিকভাবে ব্যস্ত রয়েছে- বেশিরভাগ সিনিয়র কমিউনিটি অনেক সামাজিক সুবিধা দিয়ে থাকে। স্থানীয় উপসনালয়ে, সিনাগগ অথবা মন্দিরে কি বয়স্কদের জন্য প্রোগ্রাম আছে? কমিউনিটিতে কি সিনিয়র সেন্টার আছে যা খাবার, প্রোগ্রাম বা সোশ্যাল ইভেন্টের আয়োজন করে?

যদি আপনার পিতামাতা চলাফেরা করতে শারীরিকভাবে সক্ষম থাকে, তাহলে তারা পছন্দ করে এমন ক্ষেত্র যেমন- উপসনালয়, আর্টস সেন্টার, স্কুল, লাইব্রেরি, মিউজিয়াম, হিউম্যান সোসাইটি, ফুড প্যান্ট্রি অথবা অন্য কোনোখানে ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব দেওয়া যায় কিনা দেখুন। এতে তাদের মন-মানসিকতা ভালো থাকবে।

অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব: অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব স্পষ্টতই একটি নাজুক সমস্যা। আপনার পিতামাতাকে জিজ্ঞেস করুন যে, এটি ঘনঘন হয় কিনা এবং এটি সম্প্রতি ডেভেলপ করেছে কিনা।

অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব মূত্রনালীর ইনফেকশন, স্নায়বিক সমস্যা অথবা অন্য কোনো মেডিক্যাল সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘মনে করবেন না যে এটি বার্ধক্যতার স্বাভাবিক অংশ।’

আপনি আপনার পিতামাতাকে ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকার জন্য সাজেস্ট করতে পারেন, কিন্তু তারা এখনো তরল গ্রহণ বজায় রাখতে পারেন। আপনি তাদেরকে এমন প্রোডাক্ট এনে দিতে পারেন যা অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

পরিষ্করণে অসমর্থতা: বৃদ্ধ বা বার্ধক্যগ্রস্ত পিতামাতা তাদের কাপড়-চোপড়, বিছানা, কক্ষ অথবা অন্য কিছু পরিষ্কার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। তাদের এসব কাজ আপনি ও আপনার পরিবারের অন্য সদস্যরা করে দিতে পারেন, অথবা তাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু পরিষ্কার করার জন্য উপযুক্ত লোক নিয়োগ করতে পারেন।

ওষুধ গ্রহণে বিস্মরণ: স্মৃতিভ্রংশতার কারণে বৃদ্ধ পিতামাতা ওষুধ গ্রহণ করতে ভুলে যেতে পারে। যদি তাদের ডিমেনশিয়া বা মেমোরি লস থাকে, তাদেরকে ওষুধ গ্রহণের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত। আপনি এবং আপনার পরিবারের অন্য সদস্যরা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এ কাজটি করতে পারেন অথবা এর জন্য উপযুক্ত লোক নিয়োগ করতে পারেন।

বর্তমানে ওষুধ গ্রহণের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য স্মার্টফোন অ্যাপস রয়েছে এবং কিছু অ্যাপস এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যা আপনাকে আপনার পিতামাতা ওষুধ গ্রহণ করেছে কিনা তা জানাতে অ্যালার্ট পাঠাবে।

অত্যধিক ঘুম কিংবা ঘুমহীনতা: রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘যদি ঘুমের সমস্যা হয়, তাহলে বর্তমান ঘুমের প্যাটার্ন ও প্র্যাকটিস লক্ষ্য করুন।’ তারা কি ব্যথার কারণে ঘুমাতে পারে না? এ প্রসঙ্গে রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘যদি তাই হয়, অপশনের জন্য ফার্মাসিস্ট অথবা হেলথকেয়ার

প্রোভাইডারের সঙ্গে কথা বলুন। বিছানায় যাওয়ার পূর্বে অ্যাসিটামিনোফেন সেবন ঘুম আনয়নে সাহায্য করতে পারে।’ তিনি পরামর্শ দেন, যদি তারা ঘুম বা রিলাক্সের জন্য অ্যালকোহলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, এর পরিবর্তে ভালো ঘুমের পরিবেশ সৃষ্টি করতে তাদেরকে মধুর সঙ্গে হারবাল টি পান করা, সফট মিউজিক শোনা, উষ্ণ গোসল কিংবা পা ভেজানোর জন্য সাজেস্ট করতে পারেন।

যদি আপনার বার্ধক্যগ্রস্ত পিতামাতা রিলাক্স নিতে না পারে, এ সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা করুন। তাদেরকে ম্যাসাজ থেরাপি সাজেস্ট করতে পারেন। রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘কারো কারো জন্য এর সমাধান হচ্ছে বই পড়া। যদি বই পড়া কঠিন লাগে, তাহলে অডিও বুক ও পডকাস্টের মতো অনেক অপশন আছে।’

প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যাঃ কোন রোগ কেন হয়?

শৈশবের সোনালি দিনগুলো শেষে তারুণ্য আর যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাতে কাটাতে মাঝবয়সটা চলে যায় ব্যাপক ব্যস্ততায়। এই ব্যস্ততাও যখন চলে যায়, তখন জীবনের শেষবেলায় আসে বার্ধক্য। এই বার্ধক্য নানা জরা, ঘাত-প্রতিঘাত আর অসুস্থতার মাঝেই কাটে।

বিশ্বে এবং দেশে গড় আয়ু এখন অনেকখানিই বেড়েছে। আর তাই আগের তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যাও বেড়েছে। একসময় মানুষের গড় আয়ু কম ছিল, বৃদ্ধ হওয়াটাই যেন একটা বড় সাফল্য ছিল তখন। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও কার্যকর চিকিৎসার সহজলভ্যতা, পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি, নিরাপদ পানীয় জলের

সংস্থান, নানারকম রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ ইত্যাদি কারণে মানুষ আজ বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারে। অনেক জটিল অনিরাময়যোগ্য রোগও অনেকাংশে নিরাময় যোগ্য হয়েছে এখন। স্ট্রোক কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিও বেঁচে যাচ্ছেন, কিডনি বা লিভারের রোগে আক্রান্ত মৃতপ্রায় ব্যক্তি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন লাভ করছেন। এসব সাফল্য আমাদের গড় আয়ু বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এতে প্রবীণদের সংখ্যাও বাড়লেও বার্ধক্যজনিত রোগ সমূহের প্রকোপও বেড়ে গেছে।

কি কি রোগ হয় প্রবীণদের

বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন ছাড়াও বৃদ্ধদের শরীরে নানাবিধ রোগব্যাধি দানা বাঁধে। শারীরিক পরিবর্তনের কারণে কিছু রোগ প্রকৃতিগতভাবে বয়স্কদের হয়। যেমন রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়া। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

প্রবীণদের মস্তিষ্ক ছোট হয়ে আসে, মেডিক্যাল বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ব্রেইন এট্রফি। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। কেউ আলঝেইমারস ডিজিজ বা ডিমেনসিয়াতে আক্রান্ত হন। ফলে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, আবেগ, অনুভূতি, বিচারবুদ্ধি, বিবেচনাশক্তি, চিন্তাশক্তি, কাজ করার ক্ষমতা ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটে। আচার আচরণে অনেকটাই শিশুতে পরিণত হন। একসময় খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেন, বিছানায় মলমূত্র ত্যাগ করেন। এছাড়াও মাথা ঘোরা, হাত-পা কাপা, যাকে বলে পার্কিনসন্স ডিজিজ, সেটাও হতে পারে।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হাড় ক্ষয়ে যায়, যাকে বলা হয় অস্টিওপরোসিস। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা বোধ হয়, মাঝে মাঝে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙ্গে যায়। এছাড়া অস্টিওআর্থ্রাইটিসের কারণে অস্থি সন্ধিতে ব্যথা হয় যেমন- হাঁটুতে ব্যথা, কোমড়ে ব্যথা এমনকি শরীর বেকে যায়। ফলে কার্যক্ষমতা আরও কমে যায়। হাঁটা চলায় ব্যাপক অসুবিধা হয়।

চোখে ছানিপড়াটাও বয়স্কদের রোগ। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেটগ্রন্থি বড় হয়ে প্রস্রাবের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এতে মূত্রধারণ ক্ষমতা কমে যায়। প্রস্রাব করতে বেশি সময় লাগে, চাপ দিয়ে প্রস্রাব করতে হয়। মলমূত্র ধরে রাখার ক্ষমতাও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পায়।

পানি ও লবণের পরিমাণ ব্যঘাত ঘটে, শীতে বা সামান্য ঠাণ্ডাতেই তাদের দেহ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাদের বিভিন্ন ধরণের ইনফেকশনে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে, যেমন নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, চামড়ার ইনফেকশন ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরণের ক্যানসারও বয়স্কদের বেশি হয়।

সমস্যা প্রকট হয় কখন

তাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার প্রধান কারণ চিকিত্সা সুবিধার অভাব। পর্যাপ্ত চিকিত্সার সুযোগ সুবিধা অনেক স্থানেই থাকেনা, থাকলেও সীমিত। বিশেষত গ্রাম পর্যায়ে। গ্রামের আর শহরের প্রবীণদের সমস্যা অনেক সময় ভিন্ন হয়। শহরে অনেক প্রবীণ সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে

সচ্ছল, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় ভোগেন বেশি। নিঃসঙ্গতা বা পারিবারিক অবহেলা এক্ষেত্রে দায়ী। গ্রামের প্রবীণদের মধ্যে আর্থিক অস্বচ্ছলতা বেশি। ভূমিহীন অস্বচ্ছল গ্রামীণরাই আর্থিক দীনতায় আরো বেশি ভোগেন। যে কারণে পরনির্ভরশীলতার কারণে খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সমস্যাটা গ্রাম পর্যায়ে অত্যন্ত জটিল।

প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যা চিকিত্সা বিজ্ঞানের একটি বিশেষায়িত বিভাগ। কিছু কিছু রোগ আছে যা শুধু বয়স্কদেরই হয়। আবার সকল বয়সেই হয় এমন রোগের লক্ষণ, তীব্রতা ও চিকিত্সা বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। বিভিন্ন ওষুধের মাত্রা বয়স্কদের জন্য কম, অনেক ওষুধ

সাবধানতার সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন হয়। এছাড়া বয়স্কদের খাবারের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সতর্কতা প্রয়োজন। তাদের সেবার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিকে নজর দিতে হয়, যা অন্য বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নাও হতে পারে। যেমন- নিয়মিত পেট পরিস্কার হচ্ছে কিনা, নিজেদের যত্ন নিতে পারছেন কিনা ইত্যাদি।

অনেক সময় বৃদ্ধরা শিশুদের মত নিজেদের সমস্যা ঠিকমত বলতে পারেন না। সেগুলো শোনা বা জোঝার মতো মানুষ বা সেবাদানকারী থাকতে হবে। এজন্য উন্নত বিশ্বে বৃদ্ধদের জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সা বিভাগ থাকে, যাকে বলে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন। বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য সমস্যা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য তারা বিশেষ প্রশিক্ষণ পান। কিন্তু এদেশে এখনও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা সীমিত। তাই দেখা যায়,

স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা যথাযথ সুবিধা পান না। এসময় অনেক রোগে সুনির্দিষ্ট উপসর্গ থাকে না, বয়স্করা সেগুলো ঠিকমত অনুভব করতে বা প্রকাশ করতে পারেন না। ফলে খুব জটিল বা মারাত্মক অসুখে বৃদ্ধরোগী সাধারণ অবসাদ, দুর্বলতা, অস্বস্তি এ ধরণের সমস্যার কথা বলেন। এতে পরিবারও খুব নজর দেয়না। চিকিত্সকও বার্ধক্যজনিত রোগ ভেবে যথার্থ মনোযোগ দেন না। এই অবহেলার কারণে অনেক রোগ নিরাময় সম্ভব হয়না।

কী করণীয়

১. প্রবীণদের জন্য আরও কিছু হাসপাতাল তৈরি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রবীণদের জন্য প্রত্যেকটি হাসপাতালে আলাদা বিভাগ থাকা প্রয়োজন।

২. প্রবীণদের অনেক বেশি সংক্রমণ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংক্রমণ থেকে যেন সুরক্ষিত থাকেন এই বিষয়ে নজর দিতে হবে।

৩. প্রবীণদের খাবারের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সুষম খাবার খেতে হবে। ব্য়স হওয়ার পর পরিপাকতন্ত্রে বিভিন্ন সমস্যা হয়। তাই গুরুপাক খাবার খওয়া যাবে না। ফল, শাকসবজি ও আঁশজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। লাল মাংস (খাসি, গরু ইত্যাদি) এড়িয়ে যেতে হবে। দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে।

৪. যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সমস্যা রয়েছে তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত খাবার খেতে হবে।

৫. প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কিছু নিয়মনীতি বা গাইডলাইন রয়েছে। সেটি মেনে চলতে হবে। বছরে দুবার হার্ট পরীক্ষা, কিডনির কার্যক্রম পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকের চেকআপে থাকতে হবে। এগুলো করলে ভালো থাকা সম্ভব।

প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা

যেহেতু প্রবীণ বয়সে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা হয়, তাই এই সময় নানা রকম রোগ শরীরে বাসা বাঁধে। প্রবীণদের প্রচলিত রোগের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক গুলজার হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ‘প্রবীণ বয়সের প্রচলিত রোগের মধ্যে রয়েছে বাতজনিত রোগ; রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস, অস্টিওআরথ্রাইটিস, অস্টিওপরোসিস। মস্তিষ্কের নানা ধরনের অসুখ, যেমন স্ট্রোক, ডিমেনসিয়া,

আলঝাইমার। হার্টের রোগের মধ্যে প্রেসার বেড়ে যাওয়া, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া। ফুসফুসের মধ্যে সিওপিডি (শ্বাসতন্ত্রের জটিল সমস্যা)। কিডনির সমস্যা (চল্লিশের পর থেকে হতে পারে), ক্যানসার। এ ছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিষণ্ণতা। যেহেতু এখন গড় আয়ু বেড়ে গেছে তাই অনেকগুলো রোগও এখন হচ্ছে।’

প্রবীণরা যেভাবে ভালো থাকবেন

প্রবীণদের সুস্বাস্থ্যের জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল। তাঁর পরামর্শ মতে,

১. প্রবীণদের সবচেয়ে বেশি যেই জিনিসটি দরকার সেটি হলো যত্ন। নবীন যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের প্রবীণদের প্রতি আরো যত্নবান হতে হবে। প্রবীণদের সঙ্গ দিতে হবে, যত্ন দিতে হবে। আন্তরিকভাবে কাজগুলো করতে হবে।

২. রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে।

৩. মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য বিনোদনের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। প্রবীণদের সবচেয়ে বড় বিনোদন হলো পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সবাই মিলে মাঝে মাঝে বেড়াতে যাওয়া যেতে পারে বা আড্ডা দেওয়া যেতে পারে।

৪. প্রবীণদের জন্য বিনোদনের জায়গা করতে হবে। সেখানে মস্তিষ্কের বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৫. আমাদের দেশে প্রবীণদের তেমন হাসপাতাল নেই। প্রবীণদের জন্য আরো হাসপাতাল তৈরি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রবীণদের জন্য প্রত্যেকটি হাসপাতালে আলাদা বিভাগ থাকা প্রয়োজন।

৬. প্রবীণদের অনেক বেশি সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংক্রমণ থেকে যেন সুরক্ষিত থাকেন এই বিষয়ে নজর দিতে হবে।

৭. প্রবীণদের খাবারের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সুষম খাবার খেতে হবে। ব্য়স হওয়ার পর পরিপাকতন্ত্রে বিভিন্ন সমস্যা হয়। তাই গুরুপাক খাবার খওয়া যাবে না।

৮. ফল, শাকসবজি ও আঁশজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। লাল মাংস (খাসি, গরু ইত্যাদি) এড়িয়ে যেতে হবে। দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে।

৯. যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সমস্যা রয়েছে তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত খাবার খেতে হবে।

১০. প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কিছু নিয়মনীতি বা গাইডলাইন রয়েছে। সেটি মেনে চলতে হবে। বছরে দুবার হার্ট পরীক্ষা, কিডনির কার্যক্রম পরীক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকের চেকআপে থাকতে হবে। এগুলো করলে ভালো থাকা সম্ভব।

আমাদের করণীয়

১. প্রথমেই মনে রাখতে হবে প্রবীণরা আমাদের পরিবারেরই অংশ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতোই তাঁর সঙ্গে আচার-আচরণ করতে হবে। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত, প্রবীণদের আদর-যত্ন দিয়ে শিশুদের মতো প্রতিপালন করা এবং তাঁদের প্রতি মায়া, মমতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। তাঁদের মধ্যে যেন কোনো ধারণা না জন্মে যে, তারা আমাদের বোঝা।

২. প্রবীণদের নিয়মিতভাবে ডাক্তার দেখাবেন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পূর্ব থেকে রোগের ধারণা নিয়ে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিন।

৩. ডাক্তারের পরামর্শমতে নিয়মিতভাবে ওষুধ খাওয়াবেন।

৪. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ পরিবর্তন বা বাদ দেবেন না। তাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।

৫. আপনার প্রবীণ লোকটি যদি ইনসুলিন নেন, তবে তাঁকে তা নিতে সাহায্য করুন।

৬. পুষ্টিবিদের নিয়ম অনুসারে প্রবীণ লোকটির খাদ্য তালিকামতে খেতে দিন।

৭. বাসার প্রবীণ লোকটিকে নিয়মিতভাবে সময় দিন। তাঁর সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করুন। হাসিখুশি রাখুন, নিজে ভালো থাকুন, প্রবীণকে ভালো রাখুন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*