মাগো কদিন পর বেতন পাইলে বাড়িত আমু, ৪ দিনের ছুটি দিছে!

‘গতকাল সকালেও ফোনে কথা কইছি হাবিবের সাথে। হাবিব জিগাইছে, মাগো কী খাইছো? আমি কইছি, বাবা আমি নাস্তা করছি। নাস্তা কই’রা মাইয়ারে পড়াইতে লইছি। তহন হাবিব কইলো, ওরে মাইরো না মা, ওরে আমি ডাক্তারি পড়ামু। ওর জন্য একটু ক’ষ্ট করও, তোমাকে ওরে নিয়া চিন্তা করা লাগবে না। মাগো কদিন পর বেতন পাইলে বাড়িত আমু, ৪ দিনের ছুটি দিছে। ২ দিন আইতে-যাইতে, আর ২ দিন তোমাগো লগে থাকমু।’

আহাজারি করে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোর অ’গ্নিকা’ণ্ডে নি’হ’ত কম্পিউটার অ’পারেটর হাবিবুর রহমানের (২৫) মা হোসনে আরা বেগম।

নি’হ’ত হাবিবুর রহমান ভোলা সদর উপজে’লার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়ন ২ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ বালিয়া বটতলা গ্রামের হরাজি বাড়ির মো. সিদ্দিক বেপারির মে’য়ের ঘরের নাতি। হাবিবুরের বাবা শাহাবুদ্দিন পটুয়াখালীর বাসিন্দা। ছোট বেলায় বাবার মৃ’ত্যু পর মায়ের সঙ্গে থাকতেন ভোলার দক্ষিণ বালিয়া গ্রামের নানা বাড়িতে।

মামা আলমগীরের সঙ্গে দীর্ঘ ৭ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। চাকরি হয় সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর কম্পিউটার অ’পারেটর হিসেবে। প্রতিদিনের মতো শনিবার (৪ জুন) রাতেও ডিপোতে নাইট ডিউটি পালন করছিলেন হাবিবুর রহমান। ওই রাতেই ভ’য়াবহ বি’স্ফোরণে অন্য সবার সঙ্গে প্রা’ণ যায় হাবিবুরের। হাবিবুর ছিলেন পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। তার মৃ’ত্যুতে কঠিন বাস্তবতার মুখে হাবিবের পরিবার।

হোসনে আরা বেগম আরও বলেন, আমা’র বাবায় ডেলি দুই-তিনবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা কইত। বাবায় এক সপ্তাহ দিনে ডিউটি করত, এক সপ্তাহ রাইতে। ৭ মাস আগে আমা’র বনাই (বোনের জামাই) মা’রা যাওয়ার সময় হাবিবুর বাড়িতে আইছিল। এই ঈদে বাড়ি আসার কথা ছিল, কিন্তু ছুটি পায় নাই তাই আসতে পারে নাই। হাবিবুরই আমাদের এক মাত্র আয়ের উৎস ছিল, আল্লাহ ওরে নিয়া গেল, এখন আমাদের কী হবে?

হাবিবুরের নানা মো. সিদ্দিক বেপারি বলেন, হাবিব ছোট থাকতেই তার বাবা মা’রা গেছে। আম’রা ছোটবেলা থেকেই লালন-পালন করে এই ৭ বছর হইছে সীতাকুণ্ডে বিএম ডিপোতে কাজ করছে। গতকাল মাগরিবের সময় হাবিবুরের সঙ্গে কথা হইছে। তখন সে বললো, নানা আমা’র রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ডিউটি, এই সময় ফোন দিয়েন না। কথা বলার পরে আর কিছু জানি না।

আজ সকালে খবর পেয়ে আমা’র ছে’লেরে ফোন দিলে সে জানায়, গতকাল রাতে ডিপুতে কেমিক্যাল বি’স্ফোরণ হয়েছে, তাতে অনেক মানুষ মা’রা গেছে। তখন হাবিবুরের কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, হাবিবুরও মা’রা গেছে। আম’রা হাবিবুরের লা’শ নিয়ে বাড়ি ফিরছি। এই হাবিবুর আমা’র স্বামী ম’রা মে’য়ে ও বাপ ম’রা নাতিনের মুখে খাবার যোগাতো। এখন আমা’র মে’য়ে ও নাতিনেরে কে দেখবো?

হাবিবুরের মামা মো. আলমগীর মোবাইল ফোনে ঢাকা পোস্ট’কে বলেন, দুপুর ৩টায় চট্টগ্রাম মেডিকেলের ম’র্গ থেকে হাবিবুরের ময়নাত’দ’ন্ত শেষে আমাদের কাছে লা’শ হস্তান্তর করেছে। আমি ও হাবিবুরের বন্ধুরাসহ ম’রদেহ নিয়ে ভোলার উদ্দেশ্য রওয়ানা দিয়েছি। রাতের মধ্যে ভোলায় পৌঁছাতে পারব। হাবিবুরের ম’রদেহ অ’গ্নিকা’ন্ডে দ’গ্ধ থাকায় বাড়িতে কবর খুঁড়ার কথা বলা হয়েছে। জানাজা নামাজের সময় নির্ধারণ করা হয়নি। যত দ্রুত হাবিবুরের লা’শ নিয়ে বাড়ি পৌঁছাতে পারব, ততো দ্রুত তাকে দাফন করা হবে।

এদিকে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইফতারুল হাসান (স্বপন) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোর অ’গ্নিকা’ণ্ডে নি’হ’ত হাবিবুরের পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে হাবিবুরের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বা’স দেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*